সংবাদ সম্মেলনে বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান

পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস নয়

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্ব সব অংশীজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখবে, তাদের উদ্বেগ ও মতামত জানবে, বাজার উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করবে এবং যৌক্তিক সমস্যাগুলোর সময়োপযোগী ও গঠনমূলক সমাধানে কাজ করবে।

তবে এক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের সততা বা শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান। দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএসইসি ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে গতকাল দুপুরে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ খান ও কমিশনার হিসেবে সু‌প্রিম‌ কো‌র্টের আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমান ও ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাফিজ-আল-তারিককে নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে গতকাল সকালে বিএসইসির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং চার কমিশনার মু. মহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো. সাইফুদ্দিন পদত্যাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে তাদের পদত্যাগপত্র জমা দেন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএসইসি ভবনে এসে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা সংবাদ সম্মেলনে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকসহ বিএসইসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক বাজারে রূপান্তর করা সম্ভব। তবে এজন্য কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। মিউচুয়াল ফান্ড উন্নয়ন, বাজারের দুর্বলতা দূর করা, মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি এবং সেলফ-রেগুলেশন চালু করা জরুরি। পাশাপাশি শুধু ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন দিয়ে অর্থনীতি বড় করা সম্ভব নয়। তাই শক্তিশালী পুঁজিবাজার প্রয়োজন। নতুন আর্থিক পণ্য চালু, লিকুইডিটি বৃদ্ধি এবং কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়লে বিদেশী বিনিয়োগ আসবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছ, আন্তর্জাতিক মানের তথ্য ও ডকুমেন্টেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাজার সঞ্চয়ী হিসাব নয়—এখানে ঝুঁকি থাকে এবং বিনিয়োগের আগে জ্ঞান ও বিশ্লেষণ দরকার। সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর কোনো ধরনের অযাচিত চাপ নেই। আমরা বিশ্বাস করি, আপনাদের সহযোগিতা পেলে আমরা সফল হব। ভুল হলে অবশ্যই ধরিয়ে দেবেন, আর সঠিক কাজ করলে উৎসাহ দেবেন।’

নতুন কমিশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সদ্য নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেন, ‘অতীতে পুঁজিবাজার কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যার ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে এবং ভালো মানের কোম্পানির অংশগ্রহণ সীমিত হয়েছে। তবে দেশের অর্থনীতি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক। নতুন কমিশনের ভিশন হলো বাংলাদেশকে একটি স্বচ্ছ, প্রাতিষ্ঠানিক ও আস্থাভিত্তিক উদীয়মান পুঁজিবাজার হিসেবে গড়ে তোলা। কমিশনের প্রধান অগ্রাধিকারগুলো হলো স্মার্ট ও ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা হ্রাস, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, ভালো মানের কোম্পানির তালিকাভুক্তি বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ শক্তিশালী করা, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগ জোরদার করা এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষা নিশ্চিত করা।’

তিনি আরো বলেন, ‘পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে মানসম্মত কোম্পানির ঘাটতি রয়েছে, যা দূর করতে বহুজাতিক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বড় দেশীয় কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহিত করা হবে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর ও নীতিগত সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। পুঁজিবাজারকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভরতা থেকে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনির্ভর কাঠামোয় রূপান্তর করা হবে। পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও আইন প্রয়োগে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই ও সিডিবিএলকে সমন্বিত করে রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। বিশেষ নজর থাকবে ঝুঁকিপূর্ণ জেড ক্যাটাগরি শেয়ারের ওপর। ইনসাইডার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড, পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্পসহ সব ধরনের কারসাজির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। যারা অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে। আমাদের লক্ষ্য দাম নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করা। মূল্য নির্ধারণ করবে বাজার নিজেই; কারসাজির মাধ্যমে নয়। কমিশনের মূল লক্ষ্য হলো আস্থা পুনর্গঠন। ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তোলা হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন ঘটাবে।’

কমিশনার নাফিজ আল তারিক বলেন, ‘এমন এক সময়ে আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করেছি, যখন দেশের পুঁজিবাজার একটি ক্রান্তিলগ্ন সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে এবং বাজারে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। আমরা আশা করি, একটি দল হিসেবে একসঙ্গে কাজের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। নতুন নতুন প্রডাক্ট চালু করা, বাজারকে আরো বিনিয়োগবান্ধব করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভালো একটি পুঁজিবাজার রেখে যেতে চাই। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, ১০ বছরের মধ্যে দেশের মূলধনের বড় একটি অংশ মিলেনিয়াল ও পরবর্তী সময়ে আলফা জেনারেশনের হাতে থাকবে। তাই আমাদের এখনই ভাবতে হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেমন পুঁজিবাজার চায়। তারা নিশ্চয়ই আগের ধ্যান-ধারণার বাজার নয়; বরং প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ, ফ্রি ও ফেয়ার একটি আধুনিক ক্যাপিটাল মার্কেট প্রত্যাশা করবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করতে চাই। এ যাত্রায় আমরা আপনাদের সবার সহযোগিতা আশা করছি।’

কমিশনার নাহিদ মাহতাব বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমি মনে করি, বিএসইসির মতো একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন-কানুন ও বিধি-বিধান যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা এবং সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সবার যদি সদিচ্ছা থাকে এবং আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারি, তাহলে অবশ্যই দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়ন সম্ভব।’

কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান তার বক্তব্যে বলেন, ‘আমি আগে আশা ইন্টারন্যাশনালের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ছিলাম। লন্ডনের পুঁজিবাজারে সব ধরনের উত্তম চর্চাগুলো আমি এখানে নিয়ে আসব। এখানে আসতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং সবার সহযোগিতা কামনা করছি।’

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, ‘মানুষের সঞ্চয়কে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে রূপান্তরে পুঁজিবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার কারণে দেশের পুঁজিবাজার কাঙ্ক্ষিতভাবে বিকশিত হয়নি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ব্যাংক খাতেও চাপ সৃষ্টি করেছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার কাজ করছে এবং সেই ধারাবাহিকতায় বিএসইসিতে নতুন নেতৃত্ব এসেছে। এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে গতি, সুশাসন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করি।’

আরও